সঙ্গীত এক নীরব মাধুর্য

সৌমী ভট্টাচার্যের কণ্ঠে ভাঙা গান শ্রবণের পর নিজস্ব অনুভূতি :

শ্রীমতী নীলিমা সাহা

সঙ্গীত এক নিরব মাধুর্য যা ব্যক্তিগত নয়, বিশ্ব গত । বলা যায় সৃষ্টিশীলতার আদিরূপে লিপিবদ্ধ এক মায়ার মোহিনী মুহূর্তকে ছাপিয়ে পরিব্যাপ্ত আবার স্থিরীভূত, সুরের সাধনার সঙ্গে ভাবের বোধের এক উন্নীতকরণ বলা চলে । প্রসঙ্গত বলতে হয় সকল শিল্পের মধ্যে শ্রেষ্ঠ শিল্প হলো সংগীত শিল্প, যা সুরের ভিন্নতা এবং ঐক্যবোধের এক উচ্চতায় মনকে পৌঁছে দেয় । সেখানে শ্রোতাও অনুধ্যানের স্থান করে নেয় এবং তা সকল কালের ঊর্ধ্বে চিরকালের বোধে উন্নীত, মানব চৈতন্যে প্রকাশিত এক আনন্দ । কবির ভাষায় আনন্দেরই ছবি দিগন্তেরই কোলে কোলে - এক কল্পমায়া তমসা জারিত অথচ আনন্দময় বিন্যাস । বলাবাহুল্য সংগীত মূলত এমন‌ই ধ্বনি-নির্ভর যে দৃশ্য ও শ্রবণেন্দ্রিয়ে স্পর্শের অনুভূতি খেলে যায় ।

বাংলা গানের কাঠামো ভেঙে নতুন সুরে সংগীত সৃষ্টির প্রয়াস বলা যায় এক পুরনো প্রচলন । বাংলা সংগীতের ধারায় অধিকতর শক্তিমান একক সৃষ্টিশীল ব্যক্তিত্বের কথা বলতে গেলে অবশ্যই যার নাম সর্বাগ্রে মনে আসে, তিনি রবীন্দ্রনাথ । তিনি স্বরচিত অধিকাংশ গানে নিজেই সুরারোপ করেছেন, একাধারে সুরকার গীতিকার তিনি । প্রসঙ্গত রবীন্দ্র সমালোচক বুদ্ধদেব বসু পরবর্তীতে স্বীকার করে বলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ একজন মানুষ নন  একশো জন মানুষ । বহতা স্রোতস্বিনী থেকে এক ঘটি জল তুলে বলা যায় এটি আমার রবীন্দ্রনাথ ।

আশিটি প‌ঁচিশে বৈশাখের একটি সম্পূর্ণ মালার বৃহৎ প্রেক্ষাপট স্পর্শ করার কাজটির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো তার ভাঙ্গা গানের প্রতি স্পর্শকাতরতা । ভাঙ্গা গান যার আরেক নাম রূপান্তরী গান । জীবনের স্বাভাবিক যাত্রাপথে দুঃখ বা আনন্দকে গ্রহণ করার বায়োপিক উপহার যেভাবেই আসুক, ঘটনাক্রমের গণিতে রবীন্দ্রনাথ আবিষ্কৃত আধুনিক তথা উত্তর-আধুনিক পর্বের এক স্ফটিক ভাবনা তার সৃষ্ট ভাঙ্গা গানের মাধুর্য অনুভূত হয় । রবীন্দ্রনাথ ব্যতিরেকে হিন্দুস্তানি সংগীতাশ্রয়ী উচ্চাঙ্গ শাস্ত্রীয় সংগীত, বাউল গান, পাশ্চাত্য সঙ্গীত বহু ধারার মধ্যে ভাঙ্গা গানের অধুনা প্রচলন বিশেষ আকর্ষণীয় ও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ।

ভাঙ্গা গানের আসরে পসরা সাজিয়ে উপস্থিত জনপ্রিয় এমনই এক শিল্পী, সৌমি ভট্টাচার্য। তার মুখোমুখি আমরা একটু শুনি তাকে, তার প্রথম গানে - তনু মিলন দে পরবার - শ্রী রাগ সন্ধ্যেবেলার রাগ, তেওড়া তাল, মূল এই গানটি গীত হলে তিনি পৌঁছে যান রবীন্দ্রগানে । রবীন্দ্রনাথের ভাঙ্গা গানটি হল - কার মিলন চাও বিরহী - পূজা পর্যায়ের গান । ধ্রুপদ অঙ্গের গান । গানটিতে যেন সমূহ শান্তির আরাম খুঁজে পাই । পরের গানটি 'সুন্দর লাগৌরী হই' - মূল এই গানটি । ঠুংরি ভাঙ্গা গান, আড়ানা রাগ, এক তালের উপর । গানটি গীত হলেই তিনি ফিরে যান রবীন্দ্রনাথের ভাঙা গানে - 'মন্দিরে মম কে আসিলে হে' - রবীন্দ্রনাথের অলংকার বহুল শব্দ চয়ন এবং পঙক্তির অন্ত্যমিলের সঙ্গে গায়িকার গায়কী ঢং - মিলেমিশে প্রাপ্ত এক হৃদয়ের ভাষা, এক স্বর্গীয় সুখ তথা আনন্দময়তা, অবুঝ মনে ঘিরে থাকে বহুক্ষণ, খেলতে থাকে সবুজতা ।

আসলে শান্তিনিকেতনের সাংগীতিক পরিবেশ ছিল একেবারেই অন্যরকম,  তদুপরি প্রকৃতির সৌন্দর্যে এক  মন-ভালোর দুনিয়া । বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সমাগত গুণীজন-দত্ত শিক্ষার ঔরসে এক ঐতিহ্যবাহী আবহাওয়ার আস্বাদন প্রাপ্তি মোটেই কম জিনিস নয় । এরপর আনুষ্ঠানিক পর্যায়ের একটি গান, মূল গানটি - 'এ আয়ো ‌ফাগুন বড় মান' - ধামার ধ্রুপদ অঙ্গের এই গানটিরই ভাঙ্গা গান হিসেবে রবীন্দ্রনাথ উপহার দিলেন মুক্তছন্দে রচিত এই গানটি 'সুধাসাগারতীরে এসেছে নর-নারী' - ধামার তাল, আনুষ্ঠানিক পর্যায়ের - বিশেষত ব্রাহ্ম ধর্মাবলম্বীদের বিবাহ বাসরে গীত এই গানের মাধুর্যের কথা ভাবতে গেলে রোমাঞ্চিত হতে হয় । মহিলা আচার্য দ্বারা পরিচালিত এই বিবাহ আসর অধুনা লুপ্তপ্রায়, তবু কথা ও সুরকে রাগাশ্রয়ী করে একেবারে অন্য পর্যায়ে পরিবেশন করার প্রয়াস তথা সাধনায় এক অনন্য সুন্দর প্রাপ্তি অপেক্ষা করে ।

অতঃপর গায়িকার কন্ঠে শ্রুত হয় পাশ্চাত্য সঙ্গীতের উপর রবীন্দ্রনাথ সৃষ্ট ভাঙ্গা গান । বাল্মিকী প্রতিভা গীতিনাট্যে 'কালী কালী বলো রে আজ' গানটি ব্রিটিশ গান Nancy Lee গানের ছায়া অবলম্বনে রচিত । ফ্রেডারিক ওয়েদারলির লেখা ও স্টিফেন অ্যাডামসের সুরারোপিত এই ব্যালাড জাতীয় প্রাচীন গাঁথাটি রবীন্দ্রনাথ ভাঙলেন একটি ভক্তিমূলক গানের পরিবেশনে । গায়িকার পরবর্তী 'বিপুল তরঙ্গ রে' গানটি ভীমপলশ্রী রাগে তেওরা তাল । মূল রাগটি কৃষ্ণের বন্দনা মূলক 'নাচত ত্রিভঙ্গয়ে নন্দ নন্দন বৃন্দাবন ' গানটিকে কবি ভাঙলেন 'বিপুল তরঙ্গ রে' - পূজা পর্যায়ের এক গম্ভীর গান ।

বলাবাহুল্য যে ১৮৮০ সালে সদ্য বিলাতফেরত রবীন্দ্রনাথ 'বাল্মিকী প্রতিভা' গীতিনাট্যে দেশি-বিদেশি সুরে গান ভাঙলেন । জীবনস্মৃতিতে তিনি লিখেছেন 'য়ুরোপের সংগীত যেন মানুষের বাস্তব জীবনের সঙ্গে বিচিত্রভাবে জড়িত' বস্তুতপক্ষে রবীন্দ্রনাথের পূর্বেই দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ কর্তৃক উক্ত ‌‌ক্ষেত্রটি প্রস্তুত হয়েছিল । রবীন্দ্রনাথ ইংল্যান্ড শুধু নয়, বিদেশ থেকে ফিরেই বিদেশী সুরে গান ভাঙতে শুরু করেন ।

অনুরূপভাবে নিদর্শনস্বরূপ 'হরিনাম দিয়ে জগৎ' এই মূল গানটির ভাঙ্গা গান - 'যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে'। এইরকম 'আমি কোথায় পাব তারে' মূল গানের ভাঙা গানে রবীন্দ্রনাথ সৃষ্টি করলেন 'আমার সোনার বাংলা', আবার 'মন মাঝি সামাল সামাল' এই মূল গানের ভাঙ্গা গানটি রচনা করলেন 'এবার তোর মরা গাঙে'। তবে রবীন্দ্রনাথ রচিত প্রথম গান 'গগনের খালে রবি চন্দ্র দীপক জ্বলে'। এই গানটি জ্যোতিরিন্দ্রনাথ কর্তৃক সুরারোপিত । আরও বলতে হয় যে এই গানটি তাঁর জীবনের প্রথম গান যা বিদেশী ভাষায় রচিত কোন গানের ভাব ও সুরাশ্রিত । মূলত গানটি ধর্মগুরু নানক রচিত "গগনের থালে রবিচন্দ্র দীপক বনে" । দেশভ্রমণকালে পিতা দেবেন্দ্রনাথের সঙ্গে পাঞ্জাবের অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরে অবস্থান করেন এবং শিখ সম্প্রদায়ের উক্ত ভজনসঙ্গীত দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এই রচনাটি করেন । শুধু তাই নয়, তারানা সুরে দারাদিম দারাদিম ও তোম তানা নানা অনুসরণে কবির বিখ্যাত গান দুটি যথাক্রমে - 'সুখহীন নিশিদিন' এবং 'ওই পোহাইলো তিমিররাতি' । জীবনের প্রথমভাগে ইউরোপে পড়তে গিয়ে পাশ্চাত্য সংগীতের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন । Auld Lang Syne - এর should Auld acquaintance be forgot গানের অনুসরণে লিখলেন, 'পুরানো সেই দিনের কথা' গানটি । ইংরেজি-ভাষী দেশে নাগরিকের মৃত্যুতে বা যে কোনো বিদায়ের কালে গানটি গীত হয় ।

আবার‌ও ফিরে আসি মধুস্বরা স্বচ্ছন্দ পারঙ্গমা গায়িকা সৌমী ভট্টাচার্যের গানে । তার কণ্ঠে গীত মূল তারানা দারাদিন দারাদিন দারাদিন দারা । ভাঙা গানে সেটি 'সুখহীন নিশিদিন' সংগীতটি । রবীন্দ্রনাথের মতে এটি পূজা পর্যায়ের । কিন্তু গায়িকার অনুভবে এটি স্বদেশের অনুষঙ্গে পূজা পর্যায় - তালে ত্রিতাল, নট মোল্লার রাগ, মূল তারানা । বলার অপেক্ষা থাকে না সঙ্গীত শিল্পীর স্বতস্ফূর্ত স্বাধীন গায়কীয়ানা । ভারতীয় মার্গ সঙ্গীতে ঘরানার চল আছে । সেই ঘরানারই ঢংকেই গায়কী বলে - রবীন্দ্রসঙ্গীতে এই গায়কীকে অবহেলা করা যায় না এবং গায়িকা তা মেনেই চলেছেন । সুরবিন্যাসে এখানেই শিল্পীর ভূমিকা । সংগীত রচয়িতা কেবল সুরস্রষ্টা নন, বাঁধা পথে অনুশীলন অধ্যাবসায়ের মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন করতেই হয় । তবুও তার তাপ-শৈত্য গতি-স্থিতি চলনের বাঁক সবই সুনিপুণ অনুভূতির আচ্ছাদনে হয় শ্রোতার মনোরঞ্জন । বলতে হয় সুগায়িকা সৌমী ভট্টাচার্য একজন সফল শিল্পী । গায়িকার কন্ঠে পরের গান পুরাতনী গান । রচয়িতা গোপাল বড়ুয়া । ঊনবিংশ শতাব্দীর এই গানটি 'বিদ্যাসুন্দর' নাটকে মালিনী চরিত্রে গীত হয় । মূল গানটি হল 'ওই দেখা যায় বারে আমার চারদিকে মালঞ্চ বেড়া'... ভেঙে সৃষ্টি করলেন 'ঘরেতে ভ্রমর এলো গুনগুনিয়ে'। এইরকম ভাবে সুরের উৎসবে আবারও মুগ্ধতা আনলেন গায়িকা । ঝাঁপতালের উপর কাফি রাগের এই গানটি যদু ভট্টের রচনা । প্রখ্যাত কিংবদন্তি সঙ্গীতজ্ঞ এই শিল্পী রবীন্দ্র পৃষ্ঠপোষক ও রবীন্দ্রাশ্রিত । ইনি তানরাজ উপাধিতেও ভূষিত, তাঁর রচিত মূল গানটি হল - 'রুমঝুম বরখে' এই গানটি রবীন্দ্রনাথ ভাঙলেন 'শূন্য হাতে ফিরি হে নাথ পথে পথে'।  এরপর সর্বশেষ সঙ্গীতটি উপহার দিলেন একটি পাশ্চাত্য সঙ্গীত ও রবীন্দ্রনাথের সৃষ্ট ভাঙ্গা গানের নিবেদনে । গানটির রচয়িতা ও সুরকার বিখ্যাত ইংরেজ নাট্যকার বেন জনসন song to Celia কবিতা অবলম্বনে রচিত গানটি এইরকম - drink to me only with thine eyes and I will pledge with Mine;/ or leave a kiss within the cup,/ And I'll not ask for wine' - গানটিতে প্রিয়তমের কাছে নিজেকে সমর্পণ করার বাসনা ও ভাবাবেগ রয়েছে, তা রবীন্দ্রগানেও সুস্পষ্ট । রবীন্দ্রনাথের ভাঙ্গা গানটি হল - 'কতবার ভেবেছিনু আপনা ভুলিয়া' আবেগময় ব্যঞ্জনায় গীত এই সঙ্গীতটি প্রকৃতই মর্মস্পর্শী । বলাবাহুল্য গীত ভঙ্গিতে নিজস্বতা রেখেই চলেছেন গায়িকা । স্বর প্রক্ষেপণ সুন্দর ও যথাযথ । অনুভূতি শুধু নয়, সংবেদনশীল এবং রসগ্রাহী । মধুকন্ঠী এই গায়িকার সুর ও প্রয়োগ এর দক্ষতাও প্রশংসনীয় । শ্রুতিমাধুর্যও বটে । শান্ত ও চঞ্চল লয় এবং তানের বিচিত্রতায় পরিবেশিত গানগুলি উপভোগ্য হয়ে উঠেছে । সুপরিণত কন্ঠে সুরের গভীরতা একাধারে সাধনালব্ধ অভিজ্ঞতা শ্রোতৃবর্গের কাছে বিরাট প্রাপ্তি ।

আসলে স্বর ও সুরের রসায়নে 'মনোবৃত্তির শারীরিক বিকাশ' এক অনুভূতি যা সংবেদনশীল ইন্দ্রিয় বিশেষত শ্রবণেন্দ্রিয়ের পুষ্টি সাধিত হয় । ইন্দ্রিয়ানুভবের সঙ্গে স্বরের সংযোগ ঘটলেই সুরে পৌঁছে যায় এক ছবি, সেই ছবিই দৃশ্য রচনা করে, - বর্ণ সমন্বয়ের ক্যানভাসে তীব্রতা-মৃদুতা, অনুনাদের মাত্রায় সংগীত সুশ্রাব্য হয়, কারণ গায়কীর অনুভূতি পৌঁছে দেয় সেখানে, যেখানে শ্রোতা পায় তার আগ্রান ও স্পর্শ । বহুল প্রচলিত এই ভাঙ্গা গান যুগে যুগে গায়নভঙ্গির জন্য যেমন জনপ্রিয় ছিল তেমনটাই থাকবে, যদি সৌমি ভট্টাচার্যের মত সুরেলা কন্ঠের সুধারসকে আত্মস্থ করার মত পরিবেশ ও শ্রোতার প্রাপ্তি হয় ।


শ্রীমতি নীলিমা সাহা


শ্রীমতি নীলিমা সাহা বাংলা এবং প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস বিষয়ে স্নাতকোত্তর । উনার প্রকাশিত কয়েকটি কবিতার বই রয়েছে, যেমন তানপুরা ও পিলসুজ রহমানি (২০১৯), ছেদ চিহ্ন ও সন্ধিযুত্র (২০১২), অস্তিত্ব (২০০৭), পথে নিভৃতে (২০০৬), তবু মনে রাখি (২০০২) ইত্যাদি । এছাড়াও একটি প্রবন্ধ (অন্যচোখে- ২০০৪) এবং একটি গল্প সংকলন (২০০৯) প্রকাশিত হয়েছে । সেতার বাদন এবং লেখালেখি ওনার শখ ।


Comments

Popular Posts