সাধনা ও সঙ্গীত

 ব্রহ্মচারী দিবাকর চৈতন্য

সাধনা ও সংগীত এই দুই বিষয় যেন একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত । সঙ্গীত সাধনা এক উচ্চতর মাধ্যম । সাধনা ছাড়া সঙ্গীত গীত হতে পারে না আর সংগীত ছাড়া সাধনা যেন কেবলমাত্র শুষ্ক জ্ঞানার্জন । রসে-বসে সাধনের ভক্তিভাব কে আরও সমৃদ্ধ করে । সঙ্গীত মনের আবেগ কে সহজেই প্রকাশ করতে পারে । সুর-তাল-লয় ছন্দ ও বাণী মিশিয়ে হয় সংগীত। এই পঞ্চ উপাচারের সাথে মেশে ভাব আবেগ ও গায়কী - যার উৎকৃষ্ট ফসল স্বরূপ সংগীত প্রকাশিত হয় । তাই সাধনা যেমন মনকে প্রশস্ত ও প্রশান্ত করে তেমনি সংগীত কর্ণকুহর, বাকযন্ত্র সহযোগে হৃদয় ও মনের সমস্ত জটিলতা দূর করে তাকে উচ্চমার্গে নিয়ে যায় । উদাহরণ স্বরূপ সাধক রামপ্রসাদ ও শ্রীরামকৃষ্ণদেব কে আমরা দেখতে পাই । মাতৃ সাধনার সিদ্ধির জন্য যারা সংগীতকে একটি বিশেষ মাধ্যম হিসেবে স্বীকার করেছিলেন । কবিগুরু স্বয়ং ব্রাহ্মবাদী ছিলেন কিন্তু রচনা করেছেন অসংখ্য পূজা পর্যায়ের গান । তাঁর রচিত ব্রহ্মসংগীত গুলিও গভীর অন্তরের আধ্যাত্মিক সাধনার ইতিহাস সগৌরবে বহন করে চলেছে । কোন কোন ক্ষেত্রে ধ্যান কিংবা পূজার পূর্বে সংগীতের অনুরণন পারিপার্শ্বিকতার সাথে সাথে মনের ও সাধনার উপযুক্ত আবহ সৃষ্টি করে । শাস্ত্রে আছে দেবতারা স্তুতিতে সন্তুষ্ট হন । তাই সাধক সাধিকা স্তুতির মাধ্যম হিসাবে সংগীতকে বেছে নিয়েছেন, যা কেবলমাত্র কবিতার আবৃত্তি নয় বরং সুচতুর গায়কির দ্বারা গীত হয় । স্তুতি গানকে আরো মনোমোহিনী ও আকর্ষণীয় করে তুলেছে । ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এবং অর্জুন সংবাদ যা পৃথিবীর আধ্যাত্মিক আকারের শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেছে, তা গীত হয়েছিল এবং সারা পৃথিবীতেই এই বার্তালাপ শ্রীমদ্ভাগবতগীতা নামে জনপ্রিয় । সাধনা হল সেই পথ যা সাধককে ধ্যেয় বস্তুতে উপনীত করে । সঙ্গীত মানে কোন শব্দকে তারস্বরে ব্যক্ত করা নয় । সংগীত অর্থাৎ 'সম' উপসর্গ যোগে 'গী' ধাতু ও 'ত' প্রত্যয় অর্থাৎ যা সম্যকভাবে গীত হয় । এখানে এই সম্যক শব্দকে শুধুমাত্র আক্ষরিক অর্থে ধরলে হবে না। সম্যক বলতে সাধক যখন নিজের মনের মাধুরী মিশিয়ে সুর-তাল-লয় এবং ছন্দের পরিমার্জিত এবং সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে মনের ভাব কে পরিবেশন করে তখনই তাকে আমরা সম্যক রূপে গীয়তে বা সংগীত বলে অভিহিত করতে পারি । তখন সেই সংগীত আর শুধু গান থাকে না, উপাসনায় পর্যবসিত হয় । একেই কৃষ্ণ যজুর্বেদের কান্ব শাখার তৈত্তিরীয় উপনিষদে বলেছে 'ওম ইতি এতদ অক্ষরম্ উদগীথম্ উপাসিত' । অন্তর নির্যাস মানুষ নিজে জানতে পারে না । তাকে চেনাতে হয়, পথ বেধে দেয় অন্তরহীন গ্রন্থি । কিন্তু সংগীত এমন এক কলা যেখানে অন্তরের নির্যাস প্রকাশিত হয় মেদুর মননে সুললিত সুরের অনুরণনে, ছন্দপতনহীন ছন্দের অবিরাম বিগলনে । দৃষ্টিসুখের উল্লাসে সৌন্দর্যের কাছে নতশির হয়ে কবি চিত্ত 'সৃষ্টি সুখের উল্লাসে' কবিতার জন্ম দেয় । সেই কবিতাই সুর তাল ছন্দের পেলব বন্ধনে সংগীত হয়ে ওঠে । সাধনার অনেক মার্গ হয় । কর্মযোগ ভক্তিযোগ রাজযোগ এবং জ্ঞানযোগ । কিন্তু সংগীত যেন মহাযোগ ।‌ যা অতি সহজেই আত্মাকে পরমাত্মার সঙ্গে যুক্ত করে । সাধ্য সাধক এবং সাধনা এই পবিত্র ত্রয়ীকে এক করে দেয় । সংগীত সমস্ত সাধনার অনুপন্থী হিসেবে সাধকের জীবনসঙ্গী, সাধন সঙ্গী হয়েছে । মনের ভাব ব্যক্ত করার এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ মাধ্যম বোধহয় আর হয়না । শুষ্ক জ্ঞান বাদী বলে পরিচিত ভগবত শ্রীমদ্ শঙ্করাচার্যকেও আমরা দেখি ভক্তিরসে গদগদ হয়ে কত স্তোত্র‌ই না রচনা করেছেন । ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ মা সারদা দেবী ও স্বামী বিবেকানন্দ অনুসৃত শ্রীরামকৃষ্ণ সঙ্গীত একটি স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে । ঠাকুর নরেনের গান শোনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন দিনের পর দিন । আবার কোন ভালো গান শোনার সঙ্গে সঙ্গেই ঠাকুর সমাধির উচ্চশিখরে অবস্থান করতেন । আবার সুষুপ্তি মগ্না জগত জননী সারদা দেবীকেও দেখা গেছে মধ্যরাতে ভক্তের আকুল আর্তনাদ "উঠো গো করুণাময়ী, খোলো গো কুটিরদ্বার, আঁধারে হেরিতে নারী হৃদয় কাঁদে অনিবার … সন্তানে রাখি বাহিরে, আছো শুয়ে অন্তঃপুরে মা মা বলে ডেকে মোর অস্থি চর্ম হল সার," শুনে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি । প্রথম জীবনে মূর্তি পুজায় অবিশ্বাসী নরেন্দ্রনাথের জীবনেও আমরা দেখি কালী দর্শন এর পরে তার প্রথম অভিব্যক্তি "আমার মা ত্বং হি তারা" সংগীতের মাধ্যমে। ভারতবর্ষের সমস্ত মার্গের সাধকদের মধ্যেই এই সংগীতের প্রকাশ দেখা গেছে । সে বার করি সম্প্রদায়ের সন্তজ্ঞানেশ্বর থেকে শুরু করে সন্ত তুকারাম কিংবা বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের বল্লভাচার্য থেকে শুরু করে মীরাবাঈ সুরদাস কিংবা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু হোক অথবা আধুনিককালের বিভিন্ন সংগঠনের একটি মূল স্তম্ভ হল এই সঙ্গীত । খ্রিস্ট ধর্মে আমরা ক্যারল দেখতে পাই । ইসলামের সুফি সম্প্রদায়ের সঙ্গীত হল 'রবে'র সঙ্গে মেলার অন্যতম পন্থা । এক ওঙ্কার পন্থী নানক ও তার শিখ সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেও সঙ্গীত এক বিশেষ ভূমিকা পালন করে । অমৃতসরের স্বর্ণমন্দির দিবা রাত্র চব্বিশ ঘন্টা সংকীর্তন হয়ে থাকে । সংগীত ও সাধনা শুধু তাই একে অপরের পরিপূরক নয়, সুর-তাল-লয়ের সামঞ্জস্যপূর্ণ রসে জারিত সঙ্গীত সাধনার‌ই অপর নাম ।


এই আলেখ্যটি শোনার জন্য নীচের Link টি click করুন -



Divakar Chaitanya

Brahmachari Ji has had strong spiritual yearnings since his school days. In the course of his mainstream education he has earned diplomas in Software Engineering, Hardware and Networking Technologies; a Bachelor of Arts degree, Post Graduate diploma in Mass Communication and Journalism and an MBA.

He has served as Director of International Social Work Organisation, taught value education in several correctional homes in Kolkata and has also been the Principal of Contai Ramakrishna Saradashram. 

Besides he has been involved in art and culture from childhood. He has a harmonius voice and plays several instruments like tabla, pakhawaj, harmonium, tanpura etc. In fact, he used to play Tabla for All India Radio and Akash Vani at the age of 13 and has performed Shruti Natak at Akash Vani. He is also a playright, theatre actor, a documentary film-maker and a linguist.





Comments